# Tags

দিনাজপুরের আসাদুজ্জামানের বাঁশের চোঙা ফাঁদ এখন কৃষকের ভরসা

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :আমন ধানের ক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রব কৃষকের দীর্ঘদিনের মাথা ব্যথার কারণ। বিষটোপ, লোহার ফাঁদনানা কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর যখন কৃষক দিশাহারা, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে এলেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার পূর্ব খোচনা গ্রামের আসাদুজ্জামান (৪৫)। তিনি কোনো আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং এক প্রাচীন, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর বাঁশের তৈরি চোঙা ফাঁদ ব্যবহার করে ইঁদুর নিধনকে পরিণত করেছেন সফল পেশায়। আর এই পেশা থেকে তিনি মাসে আয় করছেন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা!
ফজলুল হকের ছেলে আসাদুজ্জামান গত সাত বছর ধরে এই কাজ করছেন। তার পুঁজি মাত্র ৫০টি বাঁশের চোঙা ফাঁদ এবং তাতে ব্যবহারের জন্য সুগন্ধি ধান। প্রতিদিন কৃষক নিজেরাই ডাকেন তাকে। একটি ইঁদুর ধরলেই তার আয় হয় ৫০ টাকা।

আসাদুজ্জামান জানান, তার বাবা ফজলুল হক এক আদিবাসীর কাছ থেকে বাঁশের চোঙা ফাঁদ তৈরি করা শেখেন। প্রথমদিকে তারা নিজেদের জমিতে ব্যবহার করতেন। গ্রামের মানুষের চাহিদা বাড়তে থাকায়, আসাদুজ্জামান বাবার কাছ থেকে কৌশল শিখে নেন। শুরুতে ভাড়া দিলেও সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় লোকসান হতো। তাই তিনি নিজেই মাঠে নেমে পড়েন।

প্রতি ইঁদুর বাবদ আয়: ৫০ টাকা। প্রতিদিন ফাঁদ বসান: ৪০ থেকে ৫০টি। প্রতিদিন ইঁদুর ধরে: ২৫ থেকে ৩০টি (চলতি আমন মৌসুমে)। সর্বোচ্চ রেকর্ড: এক দিনে ৩২টি ইঁদুর। মাসিক গড় আয়: ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা।
গত ৬ মাসে মারা ইঁদুর: প্রায় ৩,০০০। গত বুধবার ৪০টি ফাঁদ বসিয়ে ২৬টি ইঁদুর মারায় তার একদিনের আয় ছিল ১৩০০ টাকা। এই আয় দিয়েই তার ছয় সদস্যের সংসার, তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা চলছে।

খোচনা গ্রামের কৃষক শাহীন আলম জানান, ইঁদুরের আক্রমণে এক বিঘা জমিতে ২ থেকে ৫ মণ ধানের ক্ষতি হতে পারত। আসাদুজ্জামানের কারণে এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব কমেছে, রক্ষা পাচ্ছে শত শত বিঘা জমির ধান। তিনি এখন কৃষকের নয়নের মণি। বানুপাড়া গ্রামের কৃষক আজীম উদ্দীন মাত্র ২০টি ফাঁদ বসিয়ে ১১টি ইঁদুর মারার জন্য আসাদুজ্জামানকে ৫৫০ টাকা দিয়েছেন।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা আসাদুজ্জামানের এই কাজকে পরিবেশবান্ধব ও সবচেয়ে কার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তা জানান, ইঁদুর নিধন করে তিনি যেমন জীবিকা নির্বাহ করছেন, তেমনি আদিবাসীরা তার কাছ থেকে ইঁদুর কিনে মাংসের চাহিদাও মেটাচ্ছেন।

অনেকে তাকে আদিবাসী, মেথর বা সুইপার বললেও আসাদুজ্জামান স্ত্রীর সহযোগিতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ইঁদুর মারা আমার নেশা হয়ে গেছে। আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থে এই কাজ করে যেতে চাই।

এই বাঁশের তৈরি চোঙা ফাঁদ শুধু আসাদুজ্জামানের রুটিরুজি নয়, এটি এখন গ্রামীণ উদ্ভাবনী প্রযুক্তির এক দারুণ উদাহরণ, যা লাখো কৃষকের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে এবং কষ্টার্জিত ফসল রক্ষা করছে।